ওপেন নিউজ
  • | |
  • cnbangladesh.com
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
opennews.com.bd

মতামত

হাসিনার ভারত সফর অনিশ্চয়তার আবর্তে বিচক্ষণতার রসায়ন


Date : 04-01-17
Time : 1491105327

opennews.com.bd

ওপেননিউজ # পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী অনেক কিছুই বললেন, কিন্তু দুটি বিষয় নিয়ে তিনি স্পিকটি নট। প্রথমটি বহু-চর্চিত প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা বোঝাপড়া অথবা সমঝোতা স্মারক, যা নাকি এবার সই হতে চলেছে। দ্বিতীয়টি তিস্তা। মনে হচ্ছিল, প্রবীণ, প্রাজ্ঞ ও কুশলী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গোল করে ঘিরে যেন লক্ষ্মণের গণ্ডি কাটা রয়েছে।
অথচ আমরা, সাত-সাতজন ভারতীয় সাংবাদিক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরের আগে বাংলাদেশ সরকারের অতিথি হয়ে ঢাকায় এসে পদ্মা অতিথিশালায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজের আসরে তাঁর মুখোমুখি হয়ে খাওয়া ভুলে কলমহাতে নিবিষ্ট। ভাবখানা এই, যেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটা কিছু বলবেন, যা এ-যাবৎ জল্পনার অবসান ঘটাবে।
ঘণ্টাখানেক ধরে মাহমুদ আলী ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যে কটা কথা বারবার বললেন, সেগুলো এই রকম। এক. বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সেরা সময় এখন চলছে। দুই. দুই দেশের মধ্যে অধিকাংশ সমস্যাই মিটে গেছে। তিন. পানিবণ্টন সমস্যারও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে। চার. এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে যারা সমর্থন করেনি, যারা এখনো সক্রিয়ভাবে সরকারের বিরোধিতা করে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশে থাকতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকশিত হয়ে গণতন্ত্রী ও অসাম্প্রদায়িক আবহেই বাস করতে হবে। এবং পাঁচ. ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটাকে আমরা সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। একটা কিছু (তিস্তা) হয়নি বা হচ্ছে না বলে সম্পর্কটা ভেসে গেল, এভাবে আমরা ভাবি না।
তাহলে প্রতিরক্ষা চুক্তি অথবা সমঝোতা স্মারক কিংবা বোঝাপড়া? শুনে মাহমুদ আলী হাসলেন। অপেক্ষায় থাকার পরামর্শ দিলেন। নেত্রীর ওপর বিশ্বাস রাখার কথা বললেন। কিন্তু এমন একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না, যা এ নিয়ে নতুন ভাবনা-চিন্তার সুযোগ এনে
দেয় অথবা দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই হয়। এর ঠিক এক দিন আগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হলো, প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যা কিছু লেখালেখি হচ্ছে, সব ‘কল্পনা’। আর বলা হয়, এই সফর সম্পর্কের এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
নতুন যুগের সূচনা প্রতিদিনই নতুন করে হচ্ছে। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও বহুমুখী। বহু মুখে তার বিকাশও ঘটছে। বিশেষ করে, গত সাত-আট বছরে শেখ হাসিনার আমলে। অথচ দেখছি, সবকিছু ছাপিয়ে হাসিনার এবারের সফরের আগে স্রেফ দুটি বিষয় নিয়েই দুই দেশ আলোড়িত। একটি তিস্তা চুক্তির সই না হওয়া, অন্যটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমঝোতা। বাংলাদেশে অদ্ভুত একটা ‘সেন্টিমেন্ট’ এবং উদ্বেগও এই কারণে ভাসমান। সেন্টিমেন্টটা এমন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের এত দুশ্চিন্তার নিরসন বাংলাদেশ করল, হাজারটা অসুবিধে সত্ত্বেও যোগাযোগের এত উন্নতি ঘটাল, তবু তিস্তার পানি পাওয়ার ‘ন্যায্য দাবির সমাধান’ ভারত এখনো করতে পারল না! ২০১১ সালে যে চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল, ২০১৫-য় ঢাকায় এসে নরেন্দ্র মোদিও যার আশ্বাস দিয়ে গেলেন, ২০১৭-তেও তা অধরা! কবে ও কীভাবে যে তা মিটবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই!
তিস্তা যদি ‘সেন্টিমেন্ট’ হয়, প্রতিরক্ষা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রটি তাহলে উদ্বেগের। এক পক্ষকাল ধরে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে এই উদ্বেগের চিহ্নগুলো লেপ্টে রয়েছে। এ দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যরাত্রির ‘টক শো’র প্রধান বিষয়ও এই সেন্টিমেন্ট ও উদ্বেগ!
দুই বিষয়েই দুই দেশের সরকার যেহেতু চুপ, কল্পনা ও জল্পনার ফানুস তাই উড়ছেই। তিস্তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষমেশ
কী করবেন, কেন তিনি এভাবে অনড়, কেন তাঁকে উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করে দিল্লি এই চুক্তিতে সই করতে পারে না, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ‘অজুহাত’ দিয়ে দিল্লিও বা অনন্তকাল নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে কি না, এই সব প্রশ্ন প্রতিদিন শুনতে হয়েছে। প্রতিরক্ষা চুক্তি কী হবে,
কেন হবে, কেমন হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকলেও বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলসহ কেউ কেউ দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। কারও কারও কথায় মনে হয়, যেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বই বিকিয়ে দিতে ভারত সফরে চলেছেন!
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া এবং দুই দেশের সরকারের নীরবতা কিছু মানুষের মনে ভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের অস্তিত্ব যে আছে, তা অস্বীকার করার নয়। গত কয়েক বছরে তা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাও বেড়েছে। কিন্তু তিস্তা প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকা এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত অস্বচ্ছতা সেই শক্তির বাড়তি ইন্ধন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলই নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মধ্যেও এই উদ্বেগ কাজ করছে। তিস্তা নামের সেন্টিমেন্ট কদর না পাওয়া তার একটা কারণ। তাঁদের ধারণা, প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তার ওপর অপর বন্ধুদেশ চীন অসন্তুষ্ট হবে। সেই চীন, যারা বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার ও বৃহৎ অস্ত্র সরবরাহকারী। এমন আশঙ্কাও প্রকাশ পাচ্ছে যে, এই চুক্তি ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার অধিকার দেবে। হঠাৎ কেন এই সব প্রশ্ন উঠছে? দুই দেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে কয়েক বছর ধরে যৌথ মহড়া চলছে। বারবার প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ট্রেনিং হচ্ছে। সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে তো বাড়ছেই। কিন্তু যেই একটা সার্বিক প্রতিরক্ষা চুক্তির তোড়জোড়ের খবর প্রচারিত হলো, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো বিরোধিতা ও অজস্র প্রশ্নবাণ। এর মধ্য দিয়ে সম্ভবত এই সত্যই প্রকাশিত, ভারতের বিশালত্ব ও তার ভৌগোলিক অবস্থান এখনো বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে সন্দেহজনক ও ভীতিপ্রদ।
এই সফরে বাংলাদেশের বহু সাংবাদিকও আমাকে প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা কার কাছ থেকে কোন শর্তে অস্ত্র কিনব, তা ঠিক করার অধিকারও কি আমাদের থাকবে না?’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হোসেন তৌফিক ইমামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, যৌথ উদ্যোগে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সই হবে বলে প্রচারমাধ্যমের খবর সত্য কি না। উত্তরে ইমাম সাহেব বলেছিলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না।’
প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত নীরবতা সত্ত্বেও ইমাম সাহেব অযাচিতভাবে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিব্যবস্থাপনায় চীনকে যুক্ত করার প্রস্তাব রাখলেন। যদিও এটা জানিয়ে দিলেন, ত্রিপক্ষীয় এই প্রস্তাব একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত। সফর শুরুর ১০ দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার এমন মন্তব্য নিতান্তই আলটপকা কি না, সফররত ভারতীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অতঃপর সেটাই হয়ে দাঁড়াল আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন উঠল, সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশ কি তাহলে চীন নামের তাসটি খেলে রাখল?
এ দেশে একটা জনপ্রিয় ধারণা হলো, প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ভারতের আগ্রহের মূল লক্ষ্য চীনের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে যতটা সম্ভব বের করে আনা। সাবমেরিন কেনার পর থেকে ভারতের সেই আগ্রহ নাকি বেড়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে লেখালেখিও কম হচ্ছে না। এই ধারণার বিরুদ্ধে কোনো অভিমত ভারতের কাছ থেকে না আসায় জল্পনাও তুঙ্গে উঠেছে। বরং অল্পদিনের ব্যবধানে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সফর সেই জল্পনা উসকে দিয়েছে। ভারত-বিদ্বেষীদের পালেও এর ফলে হাওয়া লেগেছে। ভারতের ‘সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর’ সঙ্গে সুসম্পর্কের স্বাভাবিক প্রগতির ক্ষেত্রে এই ধারণা কিন্তু সহায়ক হতে পারে না।
সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক চরিত্র ও তার বাধ্যবাধকতা অবশ্যই বোঝা প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে দেশটি দ্বিধাবিভক্ত। মুসলমানপ্রধান দেশ হয়েও তার অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী চরিত্র গোটা বিশ্বে বিরল। ধর্মীয় মৌলবাদ রোখার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরে রাখা এবং তার নিরন্তর বিকাশ ঘটানো চাট্টিখানি কথা নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিটি পদক্ষেপে বিষয়টি অনুধাবন করা প্রয়োজন। এ দেশের নাগরিকেরা তাঁদের দেশ নিয়ে গর্বিত। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ এই গর্বের আঁতুড়ঘর। এই গর্ব থেকে কখনো সেন্টিমেন্টের জন্ম, কখনো উদ্বেগের। সম্পর্ককে ক্রমাগত উন্নত করতে গেলে এই স্পর্শকাতরতাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। প্রতিবেশী বদল করা যায় না, কিন্তু বুঝদার মন অনেক জটিলতা কাটাতে পারে।
কূটনীতিতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সব সময়ই প্রাধান্য পায়। সেই স্বার্থের পটভূমি একে অপরের চেয়ে ভিন্ন। বাংলাদেশ ও ভারত এখনো পর্যন্ত পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেই এগিয়েছে। আস্থা ও ভরসা বৃদ্ধির কারণও তা। নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা সেই রসায়নকে গুলিয়ে দেবে না, সেন্টিমেন্ট ও উদ্বেগজনিত অনিশ্চয়তার আবর্তে সেই বিশ্বাসও কিন্তু ভেসে থাকতে দেখলাম।


 




মতামত



























সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতিঃ এনামুল হক শাহিন
প্রধান সম্পাদকঃ সিমা ঘোষ
সম্পাদকঃ নরেশ চন্দ্র ঘোষ

ঠিকানাঃ
২৩/৩ (৪ তালা), তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৯৭৭৭৬৮৮১১
বার্তা কক্ষঃ ফাক্সঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৬৭৬২০১০৩০
অফিসঃ ০১৭৯৮৭৫৩৭৪৪,
Email: editoropennews@gmail.com



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ নুরে খোদা মঞ্জু
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ গাউসুল আজম বিপু
বার্তা সম্পাদকঃ জসীম মেহেদী
আইটি সম্পাদকঃ সাইয়িদুজ্জামান