ওপেন নিউজ
  • | |
  • cnbangladesh.com
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
    opennews.com.bd
opennews.com.bd

শিল্প-সাহিত্য

রামেরকান্দার হাসমতের চা - আহ্‌ সে কী স্বোয়াদ !


Date : 02-04-18
Time : 1517733450

opennews.com.bd

ওপেননিউজ # লেখক-দিলীপ গুহঠাকুরতা #চা আমার অতি প্রিয় পানীয়। শুধু যে পছন্দ করি তা নয়, চা এ আমার পরম নেশা। চায়ের প্রতি টান আমার কাছে মাধ্যাকর্ষণের (গ্রাভি-টি) আকর্ষণের মতো। আমার অনেক বদনামের মধ্যে অন্যতম, কেউ ভালো চা খাওয়াবে বললে আমি তার সাথে অনেক দূর যেতে পারি। আর চা বলতে আমি প্রধানত ক্রিম টি বা দুধ চা-ই বুঝি। কিন্তু ইদানীং ভেজাল দুধ আর প্রায় মানহীন চা পাতা দিয়ে বানানো পুনঃপুন নিকৃষ্ট চা খেয়ে খেয়ে চা এর প্রতি অনুরাগ প্রায় বিরাগে পরিণত হয়েছে। দুধ চা খাওয়ার পরই পাকস্থলীর ভেতর যেন ক্যামন ক্যামন করে। আমার গিন্নি বলে, পেটে যখন সয় না, তাহলে র-চা খেলেই পারো। আপনিই বলুন, দুগ্ধবিহীন র-চা কি আসল চায়ের স্বাদ দিতে পারে! চিনি দিয়ে কি দারুচিনির কাজ হয় ! পুরান ঢাকার ‘নান্নার বিরিয়ানি’র স্বাদ কি কুরিলের ‘ভাই ভাই’ হোটেলে পাওয়া যাবে ! এই কারণে আমজনতা মনে হয় ‘র’-চা কে রং চা (অর্থাৎ ভুল চা) বলে। কি আর করা, ভুল জিনিস নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। জানি, মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন। কিন্তু নেশা বলে কথা। তাই আসল চা না পেয়ে নকল দুধচায়ের পিন্ডি চটকিয়ে শেষমেশ বাধ্য হয়ে র-চায়ের সাথে মালাবদল করেছি - প্রথমত দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, আর এখন দিনে দিনে সয়ে যাওয়া অভ্যাসে।
সপ্তাহ আড়াই আগে প্রসঙ্গ নজরুল-সঙ্গীত সংগঠনের বনভোজনে গিয়েছিলাম ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপায়। বনের ভোজনে যা হয়, সারাদিন অনেক রকম সুস্বাদু খাবার উদরপূর্তি হয়েছে, কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক পেয়ালা চা গলায় ঢালার সময় কিংবা সুযোগ হয়নি। তাই বলে বডি কেমিস্ট্রি তো ক্লাসের শান্ত ছেলের মতো চুপচাপ বসে থাকেনি। তবুও ঠেলে ঠেলে দিনটা পার করলাম।
পিকনিক শেষে সন্ধ্যায় ঢাকা ফেরার পথে আমাদের জন্য নির্ধারিত মাইক্রোবাসে চড়েই ঘোষণা দিলাম, সামনে যেখানে চা-এর দোকান পাবো, সেখানেই গাড়ি থামিয়ে সবাইকে আমি চা খাওয়াবো। আমার কথা শুনে সহযাত্রীগণ আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। আমাদের একই শকটে সেদিন ছিলেন স্বনামধন্য এনামুল কবির স্যার(আমার গীটার গুরু), সস্ত্রীক বিশিষ্ট কবি আমিনুল ইসলাম ভাই, গানপাগল আইরিন রাব্বানি আপা, গুণী গজল শিল্পী মেজবাহ আহমেদ ভাই এবং সপরিবারে কণ্ঠশিল্পী শাহিনূর আলামিন ভাই। বুঝলাম, সবার প্রাণের গভীর গোপন সারাদিন তাহলে অস্ফুট স্বরে চায়ের জন্য আকু পাকু করেছে।
আমাদের সহযাত্রী শাহিনূর আলামিন সাহেব কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা। তিনি বলেলন, চা-ই যদি খেতে চান, আমরা পথিমধ্যে রামেরকান্দা থামবো। সেখানে এমন চা পাবেন, যার স্বাদ অনেকদিন মনে থাকবে। যথাজ্ঞা - সবাই একবাক্যে মেনে নিলেন। শ্যো শ্যো আওয়াজে খালি রাস্তায় দ্রুতবেগে গাড়ি চলছে। তীর্থের কাকের মতো আমরা অপেক্ষা করছি - রামেরকান্দা কখন আসবে। কখন সেখানে গিয়ে চায়ের তেষ্টা মেটাবো। গ্রামের পরে গ্রাম, পথের মাঝে অনেক হাট, ছোটবাজার, বড়বাজার, গঞ্জকে ফুটো করে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। কিন্তু রামের দেখা নাই রে, রামের দেখা নাই। আর ওদিকে আলামিন সাহেব শুধু বলেই চলেছেন, এইতো – আর একটু সামনে গেলেই। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে একবার এক আগ্রহী মানুষ সহজ করে রিলেটিভিটি থিয়োরি বুঝতে গিয়েছিলেন। মহাত্মা আইনস্টাইন মজার উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছিলেন – ধরুন, আপনি একজন অতিশয় সুন্দরী যুবতীর পাশে বসে আছেন, তখন একঘণ্টা সময় মনে হবে এক মিনিটে উবে গেছে। আবার সেই আপনিই কখনো গনগনে আগুনের একদম কাছে গিয়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন, তখন একমিনিট সময় পার হতে মনে হবে এক ঘণ্টা লাগছে। এটাই রিলেটিভিটি। আমাদেরও তেমনি প্রতি মিনিটের দূরত্ব মনে হয় ১২শ সেকন্ডেও শেষ হচ্ছে না।
অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হলো। আলো আধারিতে মেশা এক মফস্বলের বাজার কিংবা গ্রোথ সেন্টারে এসে গাড়ি থামালো। আলামিন ভাই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে শরীরটা একটু সামনের দিকে বাঁকিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে সহাযাত্রিদের গাড়ি থেকে ভূমিতে অবতরণ করার এমনভাবে আমন্ত্রণ জানালেন, তা দেখে মনে হোল মোগল সম্রাট আকবরও মনে হয় দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে তাঁর সতীর্থদের এমনিকরে সগর্বে বিমলানন্দে মোগল সাম্রাজ্য পুনপ্রতিষ্ঠার আমন্ত্রণ জানাতে পারেননি।
আমরা মাইক্রোবাস থেকে নেমে আলামিন সাহেবকে অনুসরণ করে আগাতে থাকলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম বিভিন্ন পসরায় সাজানো অনেকগুলো সারি সারি দোকানের মাঝখানে টিনের ছাপরার একটা চায়ের দোকান। আয়তনে মেরেকেটে সাতফুট বাই আটফুট হবে। টং-এর পেছনের এবং একপাশের দেয়াল ঘেঁষে এল-প্যাটার্নের বেঞ্চ বসানো। আর এক পাশে যুবক বয়সের একজন লোক প্রসন্ন বদনে কেটলি থেকে চায়ের লিকার কাপে ঢালছেন। সেই সাথে আগুনের উপর বসানো বিরাট কড়াই থেকে সর সরিয়ে ধোঁয়া ওঠা ঈষৎ বাদামী বর্ণের গরম দুধ হাতায় করে তুলে চায়ের কাপে ঢেলে, তার সাথে চাহিদা মাফিক দু-এক চামচ চিনি মিশিয়ে খদ্দেরদের হাতে চালান করছেন। চায়ের স্টলে তখন তরুণ এবং উঠতি বয়সের ৬-৭ টি ছেলে চায়ের কাপে আড্ডা দিচ্ছিলো। যারা বলে, আজাকালকার ছোটরা বড়দের সম্মান দেয়া ভুলে গেছে, তাদের এমন সুইপিং কমেন্টকে আমি তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করি। আমাদের দেখে জমিয়ে আড্ডারত ছেলেগুলো সবাই সুর সুর করে উঠে গিয়ে বেশ সমীহের সাথে আমাদের বসার জায়গা করে দিলো।
শীতকালের সন্ধ্যারাতে আমরা ক’জন অপরিসর আসনে আঁটোসাঁটো কিন্তু আনন্দচিত্তে বসলাম। ওদিকে আলামিন সাহেব চা-কারিগরকে হাত সঞ্চালন করে বুঝিয়ে দিলেন, কিভাবে প্রতিটি কাপ ভালো করে গরম পানি দিয়ে ধুইয়ে আমাদের চা পরিবেশন করতে হবে। চা আসতে আসতে আমাদের বিস্কুট কেক চিপস ইত্যাদি টা শুরু হয়ে গেলো।এরপর গরম চা মুখে দিয়ে প্রথমেই মনে হোল, এমন জিনিস মিস করাটা আসলেই বোকামী হোত। এর আগে চায়ের দোকানের দেখা নেই বলে আলামিন ভাইকে যতটা টিপ্পনী কেটেছিলাম সবাই, এবার আমরাই তাকে সমস্বরে প্রশংসা করতে থাকলাম। গরুর খাঁটি দুধের সাথে হয়তো অন্য কিছু মেশানো আছে, না হলে চা কিভাবে এতো স্বাদের হবে – আমাদের মাঝে কোন এক বিজ্ঞজনের মতামত। আমি ঘরের বাইরে প্রায় তিনকুড়ি বয়সের এই জীবনে যে কয়জায়গায় মনভোলানো চা খেয়েছি, তার মধ্যে জৈন্তাপুরের কাছে সিলেট-তামাবিল-জাফলং সড়কের পাশে একটা টং ঘরের চা, ভারতের বর্ধমানের পান্ডুয়াতে হাইওয়ের পাশে একজন অবাঙালী মালিকের স্টলের চা এবং কাঠমান্ডু থেকে পোখারার পথে নৌবিচি নামক পাহাড়ের ঢালে চন্দ্রা রেস্টুরেন্টে খাওয়া চাএর সাথে বর্ণে-গন্ধে-স্বাদে এই চায়ের তুলনা চলে।
চা বিক্রেতার নাম জানলাম, হাসমত। অল্পবয়সী, মিতভাষী, কিন্তু চোখেমুখে জীবনানন্দ ফুটে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে বেশ রাত পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে প্রতিকাপ পাঁচটাকার বিনিময়ে চা-প্রেমিকদের হাতে হাসমত হাসিমুখে চায়ের কাপ তুলে দেন। আমি এক কাপ শেষ করে আর এক কাপ চা চাইলাম। দেখলাম, আমার দেখদেখি আমাদের আরও কয়েকজন সহযাত্রীর এক পেয়ালা চায়ে মন পুরোপুরি ভরলো না। এরপর ঢাকায় ফেরার বাকি পথ গাড়িতে একমাত্র চায়ের আলাপ আমাদের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকলো।
আজো মনে হয়, ছুটে গিয়ে হাসমতের হাতে বানানো খাঁটি গরুর স্যরি গরুর খাঁটি দুধের এক কাপ চা খেয়ে আসি। চা আমার অতি প্রিয় পানীয়। শুধু যে পছন্দ করি তা নয়, চা এ আমার পরম নেশা। চায়ের প্রতি টান আমার কাছে মাধ্যাকর্ষণের (গ্রাভি-টি) আকর্ষণের মতো। আমার অনেক বদনামের মধ্যে অন্যতম, কেউ ভালো চা খাওয়াবে বললে আমি তার সাথে অনেক দূর যেতে পারি। আর চা বলতে আমি প্রধানত ক্রিম টি বা দুধ চা-ই বুঝি। কিন্তু ইদানীং ভেজাল দুধ আর প্রায় মানহীন চা পাতা দিয়ে বানানো পুনঃপুন নিকৃষ্ট চা খেয়ে খেয়ে চা এর প্রতি অনুরাগ প্রায় বিরাগে পরিণত হয়েছে। দুধ চা খাওয়ার পরই পাকস্থলীর ভেতর যেন ক্যামন ক্যামন করে। আমার গিন্নি বলে, পেটে যখন সয় না, তাহলে র-চা খেলেই পারো। আপনিই বলুন, দুগ্ধবিহীন র-চা কি আসল চায়ের স্বাদ দিতে পারে! চিনি দিয়ে কি দারুচিনির কাজ হয় ! পুরান ঢাকার ‘নান্নার বিরিয়ানি’র স্বাদ কি কুরিলের ‘ভাই ভাই’ হোটেলে পাওয়া যাবে ! এই কারণে আমজনতা মনে হয় ‘র’-চা কে রং চা (অর্থাৎ ভুল চা) বলে। কি আর করা, ভুল জিনিস নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। জানি, মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন। কিন্তু নেশা বলে কথা। তাই আসল চা না পেয়ে নকল দুধচায়ের পিন্ডি চটকিয়ে শেষমেশ বাধ্য হয়ে র-চায়ের সাথে মালাবদল করেছি - প্রথমত দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, আর এখন দিনে দিনে সয়ে যাওয়া অভ্যাসে।
সপ্তাহ আড়াই আগে প্রসঙ্গ নজরুল-সঙ্গীত সংগঠনের বনভোজনে গিয়েছিলাম ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপায়। বনের ভোজনে যা হয়, সারাদিন অনেক রকম সুস্বাদু খাবার উদরপূর্তি হয়েছে, কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক পেয়ালা চা গলায় ঢালার সময় কিংবা সুযোগ হয়নি। তাই বলে বডি কেমিস্ট্রি তো ক্লাসের শান্ত ছেলের মতো চুপচাপ বসে থাকেনি। তবুও ঠেলে ঠেলে দিনটা পার করলাম।
পিকনিক শেষে সন্ধ্যায় ঢাকা ফেরার পথে আমাদের জন্য নির্ধারিত মাইক্রোবাসে চড়েই ঘোষণা দিলাম, সামনে যেখানে চা-এর দোকান পাবো, সেখানেই গাড়ি থামিয়ে সবাইকে আমি চা খাওয়াবো। আমার কথা শুনে সহযাত্রীগণ আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। আমাদের একই শকটে সেদিন ছিলেন স্বনামধন্য এনামুল কবির স্যার(আমার গীটার গুরু), সস্ত্রীক বিশিষ্ট কবি আমিনুল ইসলাম ভাই, গানপাগল আইরিন রাব্বানি আপা, গুণী গজল শিল্পী মেজবাহ আহমেদ ভাই এবং সপরিবারে কণ্ঠশিল্পী শাহিনূর আলামিন ভাই। বুঝলাম, সবার প্রাণের গভীর গোপন সারাদিন তাহলে অস্ফুট স্বরে চায়ের জন্য আকু পাকু করেছে।
আমাদের সহযাত্রী শাহিনূর আলামিন সাহেব কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা। তিনি বলেলন, চা-ই যদি খেতে চান, আমরা পথিমধ্যে রামেরকান্দা থামবো। সেখানে এমন চা পাবেন, যার স্বাদ অনেকদিন মনে থাকবে। যথাজ্ঞা - সবাই একবাক্যে মেনে নিলেন। শ্যো শ্যো আওয়াজে খালি রাস্তায় দ্রুতবেগে গাড়ি চলছে। তীর্থের কাকের মতো আমরা অপেক্ষা করছি - রামেরকান্দা কখন আসবে। কখন সেখানে গিয়ে চায়ের তেষ্টা মেটাবো। গ্রামের পরে গ্রাম, পথের মাঝে অনেক হাট, ছোটবাজার, বড়বাজার, গঞ্জকে ফুটো করে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। কিন্তু রামের দেখা নাই রে, রামের দেখা নাই। আর ওদিকে আলামিন সাহেব শুধু বলেই চলেছেন, এইতো – আর একটু সামনে গেলেই। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে একবার এক আগ্রহী মানুষ সহজ করে রিলেটিভিটি থিয়োরি বুঝতে গিয়েছিলেন। মহাত্মা আইনস্টাইন মজার উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছিলেন – ধরুন, আপনি একজন অতিশয় সুন্দরী যুবতীর পাশে বসে আছেন, তখন একঘণ্টা সময় মনে হবে এক মিনিটে উবে গেছে। আবার সেই আপনিই কখনো গনগনে আগুনের একদম কাছে গিয়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন, তখন একমিনিট সময় পার হতে মনে হবে এক ঘণ্টা লাগছে। এটাই রিলেটিভিটি। আমাদেরও তেমনি প্রতি মিনিটের দূরত্ব মনে হয় ১২শ সেকন্ডেও শেষ হচ্ছে না।
অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হলো। আলো আধারিতে মেশা এক মফস্বলের বাজার কিংবা গ্রোথ সেন্টারে এসে গাড়ি থামালো। আলামিন ভাই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে শরীরটা একটু সামনের দিকে বাঁকিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে সহাযাত্রিদের গাড়ি থেকে ভূমিতে অবতরণ করার এমনভাবে আমন্ত্রণ জানালেন, তা দেখে মনে হোল মোগল সম্রাট আকবরও মনে হয় দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে তাঁর সতীর্থদের এমনিকরে সগর্বে বিমলানন্দে মোগল সাম্রাজ্য পুনপ্রতিষ্ঠার আমন্ত্রণ জানাতে পারেননি।
আমরা মাইক্রোবাস থেকে নেমে আলামিন সাহেবকে অনুসরণ করে আগাতে থাকলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম বিভিন্ন পসরায় সাজানো অনেকগুলো সারি সারি দোকানের মাঝখানে টিনের ছাপরার একটা চায়ের দোকান। আয়তনে মেরেকেটে সাতফুট বাই আটফুট হবে। টং-এর পেছনের এবং একপাশের দেয়াল ঘেঁষে এল-প্যাটার্নের বেঞ্চ বসানো। আর এক পাশে যুবক বয়সের একজন লোক প্রসন্ন বদনে কেটলি থেকে চায়ের লিকার কাপে ঢালছেন। সেই সাথে আগুনের উপর বসানো বিরাট কড়াই থেকে সর সরিয়ে ধোঁয়া ওঠা ঈষৎ বাদামী বর্ণের গরম দুধ হাতায় করে তুলে চায়ের কাপে ঢেলে, তার সাথে চাহিদা মাফিক দু-এক চামচ চিনি মিশিয়ে খদ্দেরদের হাতে চালান করছেন। চায়ের স্টলে তখন তরুণ এবং উঠতি বয়সের ৬-৭ টি ছেলে চায়ের কাপে আড্ডা দিচ্ছিলো। যারা বলে, আজাকালকার ছোটরা বড়দের সম্মান দেয়া ভুলে গেছে, তাদের এমন সুইপিং কমেন্টকে আমি তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করি। আমাদের দেখে জমিয়ে আড্ডারত ছেলেগুলো সবাই সুর সুর করে উঠে গিয়ে বেশ সমীহের সাথে আমাদের বসার জায়গা করে দিলো।
শীতকালের সন্ধ্যারাতে আমরা ক’জন অপরিসর আসনে আঁটোসাঁটো কিন্তু আনন্দচিত্তে বসলাম। ওদিকে আলামিন সাহেব চা-কারিগরকে হাত সঞ্চালন করে বুঝিয়ে দিলেন, কিভাবে প্রতিটি কাপ ভালো করে গরম পানি দিয়ে ধুইয়ে আমাদের চা পরিবেশন করতে হবে। চা আসতে আসতে আমাদের বিস্কুট কেক চিপস ইত্যাদি টা শুরু হয়ে গেলো।এরপর গরম চা মুখে দিয়ে প্রথমেই মনে হোল, এমন জিনিস মিস করাটা আসলেই বোকামী হোত। এর আগে চায়ের দোকানের দেখা নেই বলে আলামিন ভাইকে যতটা টিপ্পনী কেটেছিলাম সবাই, এবার আমরাই তাকে সমস্বরে প্রশংসা করতে থাকলাম। গরুর খাঁটি দুধের সাথে হয়তো অন্য কিছু মেশানো আছে, না হলে চা কিভাবে এতো স্বাদের হবে – আমাদের মাঝে কোন এক বিজ্ঞজনের মতামত। আমি ঘরের বাইরে প্রায় তিনকুড়ি বয়সের এই জীবনে যে কয়জায়গায় মনভোলানো চা খেয়েছি, তার মধ্যে জৈন্তাপুরের কাছে সিলেট-তামাবিল-জাফলং সড়কের পাশে একটা টং ঘরের চা, ভারতের বর্ধমানের পান্ডুয়াতে হাইওয়ের পাশে একজন অবাঙালী মালিকের স্টলের চা এবং কাঠমান্ডু থেকে পোখারার পথে নৌবিচি নামক পাহাড়ের ঢালে চন্দ্রা রেস্টুরেন্টে খাওয়া চাএর সাথে বর্ণে-গন্ধে-স্বাদে এই চায়ের তুলনা চলে।
চা বিক্রেতার নাম জানলাম, হাসমত। অল্পবয়সী, মিতভাষী, কিন্তু চোখেমুখে জীবনানন্দ ফুটে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে বেশ রাত পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে প্রতিকাপ পাঁচটাকার বিনিময়ে চা-প্রেমিকদের হাতে হাসমত হাসিমুখে চায়ের কাপ তুলে দেন। আমি এক কাপ শেষ করে আর এক কাপ চা চাইলাম। দেখলাম, আমার দেখদেখি আমাদের আরও কয়েকজন সহযাত্রীর এক পেয়ালা চায়ে মন পুরোপুরি ভরলো না। এরপর ঢাকায় ফেরার বাকি পথ গাড়িতে একমাত্র চায়ের আলাপ আমাদের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকলো।
আজো মনে হয়, ছুটে গিয়ে হাসমতের হাতে বানানো খাঁটি গরুর স্যরি গরুর খাঁটি দুধের এক কাপ চা খেয়ে আসি।




শিল্প-সাহিত্য



























সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতিঃ এনামুল হক শাহিন
প্রধান সম্পাদকঃ সিমা ঘোষ
সম্পাদকঃ নরেশ চন্দ্র ঘোষ

ঠিকানাঃ
২৩/৩ (৪ তালা), তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৯৭৭৭৬৮৮১১
বার্তা কক্ষঃ ফাক্সঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৬৭৬২০১০৩০
অফিসঃ ০১৭৯৮৭৫৩৭৪৪,
Email: editoropennews@gmail.com



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ নুরে খোদা মঞ্জু
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ গাউসুল আজম বিপু
বার্তা সম্পাদকঃ জসীম মেহেদী
আইটি সম্পাদকঃ সাইয়িদুজ্জামান